ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদ, রাজনীতিতে ধর্মতন্ত্র ও আজকের ভাবনা
এক
‘ধর্ম’ ও ‘ধর্মীয়’ না লিখে লিখছি ‘ধর্মতন্ত্র’ ও ‘ধর্মতন্ত্রী’। লিখছি খুবই সচেতনভাবে ভাবনা-চিন্তা করে। আর ‘মৌলবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করছি নিতান্তই অনিচ্ছায়।
ইংরেজি ‘রিলিজিয়ন’ শব্দটিকে বাংলায় ‘ধর্ম’ বলতে আমি সর্বদাই অনীহ। অথচ এর কোনো জুৎসই বাংলাও খুঁজে পাই নি। আবার বাংলা ‘ধর্ম’ শব্দটিরও সঠিক কোনো ইংরেজি শব্দ নেই বলেই বোধ হয় স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকেও ‘মানুষের ধর্ম’ বোঝাতে ইংরেজিতে ‘রিলিজিয়ন অফ ম্যান’ই লিখতে হয়েছে। তবু, রবীন্দ্রনাথ যে ধর্ম ও রিলিজিয়নকে এক বলে মানেন নি, তাঁর বাংলা রচনায় তিনি তারও প্রমাণ রেখেছেন।
১৯১৭ সনের ৪ আগস্ট কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। ব্রিটিশ সরকার যে রাজনৈতিক কারণে শ্রীমতী অ্যানি বেসান্তকে অন্তরীণ করেছিল, তারই প্রতিবাদে এ প্রবন্ধটি লিখিত। তবু, কবি এমন কিছু বক্তব্যও প্রবন্ধটিতে উপস্থাপন করেছিলেন যা তাৎক্ষণিকতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল, সে-সব বক্তব্যের অনেক কিছুই একালের জন্যও প্রাসঙ্গিক। এই প্রবন্ধেই তিনি মানুষের শাশ্বত ‘ধর্মে’র বিপরীতে ‘ধর্মতন্ত্র’ শব্দটি ব্যবহার করেন, এবং এ দু’য়ের পার্থক্য অত্যন্ত স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়ে বলেন—
ধর্ম বলে, মানুষকে যদি শ্রদ্ধা না কর তবে অপমানিত ও অপমানকারী কারো কল্যাণ হয় না। কিন্তু ধর্মতন্ত্র বলে, মানুষকে নির্দয়ভাবে অশ্রদ্ধা করিবার বিস্তারিত নিয়মাবলী যদি নিখুঁত করিয়া না মান তবে ধর্মভ্রষ্ট হইবে। ধর্ম বলে, জীবকে নিরর্থক কষ্ট দেয় যে সে আত্মাকেই হনন করে। কিন্তু ধর্মতন্ত্র বলে, যত অসহ্য কষ্টই হোক, বিধবা মেয়ের মুখে যে বাপ মা বিশেষ তিথিতে অন্নজল তুলিয়া দেয় সে পাপকে লালন করে। ধর্ম বলে, অনুশোচনা ও কল্যাণ কর্ম দ্বারা অন্তরে বাহিরে পাপের শোধন। কিন্তু ধর্মতন্ত্র বলে, গ্রহণের দিনে বিশেষ জলে ডুব দিলে, কেবল নিজের নয়, চোদ্দ পুরুষের পাপ উদ্ধার। ধর্ম বলে, যে মানুষ যথার্থ মানুষ সে যে ঘরেই জন্মাক পূজনীয়। ধর্মতন্ত্র বলে, যে মানুষ ব্রাহ্মণ সে যত বড়ো অভাজনই হোক, মাথায় পা তুলিবার যোগ্য। অর্থাৎ মুক্তির মন্ত্র পড়ে ধর্ম আর দাসত্বের মন্ত্র পড়ে ধর্মতন্ত্র।
স্পষ্টই বোঝা যায়: রবীন্দ্রনাথ এখানে ‘রিলিজিয়ন’-এর প্রতিশব্দ রূপেই ‘ধর্মতন্ত্র’ শব্দটিকে বেছে নিয়েছেন, আর ধর্মতন্ত্রের যে-বিধানগুলোর উল্লেখ করেছেন সেগুলো স্পষ্টতই ‘হিন্দু’ নামে পরিচিত একটি রিলিজিয়ন বা ধর্মতন্ত্রের। এই ‘ধর্মতন্ত্র’ নিতান্তই সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতার ধারক। শুধু হিন্দু নয়, যে-কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মতন্ত্রই নানা ধরনের সংকীর্ণ বিশ্বাস সংস্কার ও আচার-আনুগত্যের বৃত্তে আবদ্ধ। কিন্তু ‘ধর্ম’ মোটেই সে-রকম নয়। ধর্ম দেশ-জাতি-বর্ণ-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে সকল মানুষের মনুষ্যত্বকে ধারণ করে। আমরা বলতে পারি: মনুষ্যত্বই মানুষের ধর্ম। যেমন বলি: পশুর ধর্ম পশুত্ব, জলের ধর্ম জলত্ব, আগুনের ধর্ম অগ্নিত্ব ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ বস্তুজগৎবা প্রাণীজগতের প্রত্যেকের যা অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য, তা-ই তার ধর্ম। তবু, অন্য সকলের ধর্মের সঙ্গে মানুষের ধর্মের একটি বড় ধরনের পার্থক্য আছে। জল বা আগুনের মতো অচেতন পদার্থের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য তথা ধর্ম তো একান্তই জড় প্রকৃতি-নির্ধারিত, আপন ধর্ম থেকে ভ্রষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ কোনো অচেতন পদার্থেরই নেই। অন্যদিকে পশুরা পরিপার্শ্বের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য বা খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য তাদের চেতনাকে অনেক পরিমাণে কাজে লাগাতে পারে বটে, তবু পশুদের ধর্মও তাদের জৈব প্রকৃতি-নির্ধারিত ও সহজাত প্রবৃত্তিমূলক, সেই প্রবৃত্তিমূলকতার ঊর্ধ্বে অবস্থানের কোনো ক্ষমতা কোনো পশুরই নেই। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ অন্যরকম। মানুষও অন্য অন্য পশু বা প্রাণীর মতো কতকগুলো সহজাত প্রবৃত্তি নিয়েই জন্মায়, তবু কেবল সহজাত প্রবৃত্তির আনুগত্য করেই সে 'মানুষ' হতে পারে না। মানুষ হওয়ার জন্য সহজাত প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সহজাত প্রবৃত্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার বদলে মানুষকে এর নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে হয় এবং এমনটি করেই সে মানুষ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments